এ দেশে দ্বীনি শিক্ষার বিস্তারে মাদ্রাসাগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। হাজারো আলিম, আলিমা ও দ্বীনদার প্রজন্ম গড়ে তোলার নেপথ্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো অবদান রাখছে। তাই মাদ্রাসা শিক্ষাকে আরও আধুনিক, শক্তিশালী, নিরাপদ ও আস্থাশীল করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মাদ্রাসাকেন্দ্রিক কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এ বাস্তবতায় প্রভাবশালী আলিম, দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ এবং মাদ্রাসা পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা ও আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা করা।
আমরা যদি নিজেদের ভুলগুলো নিজেরাই সংশোধন না করি, তাহলে একসময় দ্বিতীয় বা তৃতীয় পক্ষ সেই সুযোগ গ্রহণ করবে। তখন সামগ্রিকভাবে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাই অযাচিত চাপ ও সংকটের মুখে পড়তে পারে। দেশের নানা প্রান্তে গণহারে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অসংখ্য মাদ্রাসা এবং হিফজখানা গড়ে উঠেছে যেগুলোতে কোন সিসি ক্যামেরা নেই, যথাযথ তদারকি নেই। নেই মান সম্পন্ন পরিবেশ কিংবা উন্নত পাঠদান ব্যবস্থা। প্রায়শই এসব প্রতিষ্ঠানে সংগঠিত নানা অপ্রীতিকর ঘটনার ছবি ভিডিও প্রকাশ পাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; যা মাদ্রাসা শিক্ষার ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করছে।
ধর্মীয় শিক্ষাদানকারী প্রতিষ্ঠান হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তা জবাবদিহিতা, সুশাসন ও মানোন্নয়নের ঊর্ধ্বে থাকবে। বরং দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও জবাবদিহিতা আরও দৃশ্যমান হওয়া উচিত। যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য অনুমোদন, নিবন্ধন, মানসম্মত পাঠ্যক্রম, ভালো শিক্ষক, নিরাপদ অবকাঠামো, নিয়মিত শিক্ষক প্রশিক্ষণ, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, দক্ষ পরিচালনা ব্যবস্থা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক নিবন্ধন, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা, এবং গুরুতর অপরাধে জড়িত শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের মতো পদক্ষেপও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। মাদ্রাসাগুলোতে শাসনের নামে অতিরিক্ত শারীরিক শাস্তি, বেত্রাঘাত ও টর্চারের ঘটনাও মাঝে মাঝেই ঘটে। এই ঘটনাগুলোও ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি জনমনে নেতিবাচকতা জ্ন্ম দেয়।
এমন কোনো আচরণ, যা শিশুর মনে ভয়, অপমান বা দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ট্রমা সৃষ্টি করে— তা শিক্ষার উদ্দেশ্যের সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। শৃঙ্খলা অবশ্যই থাকতে হবে, তবে তা হতে হবে প্রজ্ঞা, ভালোবাসা ও মানবিকতার ভিত্তিতে। জোর করে বিদ্যা চাপিয়ে দেয়ার নাম শিক্ষা নয়, শিক্ষা হল আপনার সন্তানের সত:স্ফুর্ত আত্মবিকাশ। আমাদের এই পর্যালোচনা মাদ্রাসার বিরুদ্ধে নয়; বরং মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে। দ্বীনি শিক্ষার মর্যাদা, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং সমাজের আস্থা অটুট রাখতে এখনই কার্যকর ও সময়োপযোগী সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
Leave a Reply