রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ০৫:৪২ পূর্বাহ্ন
সম্প্রতি ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী উড়োজাহাজের টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। অতীতে মাত্র ২০-৩৫ হাজার টাকায় যে টিকিট পাওয়া যেত, এখন তার দাম এক লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলে অনেক প্রবাসী কর্মী দেশে আটকা পড়েছেন, এবং তাদের জীবিকা আজ হুমকির মুখে।
মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অধিকাংশ বাংলাদেশি কর্মীর মাসিক বেতন ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকার মধ্যে। তাদের জন্য এক লাখ টাকার টিকিট কিনে কর্মস্থলে ফেরা প্রায় অসম্ভব। একজন প্রবাসী কর্মী তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ছুটি নিয়ে দেশে এসেছিলাম, কিন্তু টিকিটের দাম এত বেশি যে এখন আর ফিরে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমি চাকরি হারানোর ভয়ে আছি।
প্রবাসীরা মনে করছেন, এক অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে এই টিকিটের দাম বাড়িয়ে চলেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট থেকে আবুধাবি, দুবাই ও শারজাহতে সরাসরি ফ্লাইট থাকা সত্ত্বেও এই কারসাজি চলছে। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, দুবাই থেকে ঢাকামুখী ফেরার টিকিটের দাম এখনো ২১-২৩ হাজার টাকাই আছে, যা স্পষ্ট করে যে এই মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক নয়, বরং একটি পরিকল্পিত সিন্ডিকেটের কারসাজি।
এই সংকট সমাধানে বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে সরকারের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB) এবং প্রতিযোগিতা কমিশনের দ্রুত নজরদারি প্রয়োজন। যদি এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে প্রবাসীদের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিমান টিকিটের দাম নিয়ন্ত্রণ, এই অসাধু সিন্ডিকেটকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রবাসীদের জন্য সহনীয় মূল্যে টিকিট নিশ্চিত করতে সরকারি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।
এদিকে আকাশপথের যাত্রীদের স্বার্থ সুরক্ষায়, বিশেষ করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রতারণা রোধে, সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ২১ আগস্ট বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, যা বিমান যাত্রী এবং ট্রাভেল এজেন্সি উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা বহন করে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি জারি করা একটি পরিপত্র অনুযায়ী টিকিটের গায়ে বিক্রয়মূল্য উল্লেখ করার নির্দেশনা থাকলেও তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। ফলে যাত্রীরা অতিরিক্ত দামে টিকিট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন এবং প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। এই অনিয়ম বন্ধ করতে মন্ত্রণালয় সকল ট্রাভেল এজেন্সিকে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট শর্ত মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, সকল ট্রাভেল এজেন্সিকে এখন থেকে প্রতিটি এয়ার টিকিটের গায়ে তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম, লাইসেন্স নম্বর এবং টিকিটের প্রকৃত বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। এই নিয়ম মেনে না চললে বা কোনো ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি বা সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে, তাদের নিবন্ধন বাতিলসহ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একই সাথে, বিজ্ঞপ্তিতে বিমান যাত্রীদের প্রতিও কিছু সতর্কতা জারি করা হয়েছে। যাত্রীদের টিকিট কেনার সময় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে এবং কেনা টিকিটে বিক্রয়মূল্য ও ট্রাভেল এজেন্সির নাম সঠিকভাবে লেখা আছে কিনা তা যাচাই করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো, অনিবন্ধিত কোনো ট্রাভেল এজেন্সির কাছ থেকে টিকিট না কেনা।
এই বিজ্ঞপ্তি এমন এক সময়ে এলো যখন মধ্যপ্রাচ্যগামী বিমান টিকিটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রবাসীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সরকারের এই পদক্ষেপের ফলে আশা করা যাচ্ছে যে, টিকিট কেনাবেচায় স্বচ্ছতা ফিরে আসবে এবং অসাধু চক্রের কারসাজি বন্ধ হবে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাবেন এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মোহাম্মদ ইমরান স্বপন: সাহিত্যিক ও গণমাধ্যম কর্মী
Leave a Reply