1. admin@thedailyagnikontho.com : admin :
সমাজে হিজড়া জনগোষ্ঠী একটি অবহেলিত সম্প্রদায়! - দৈনিক অগ্নিকন্ঠ

রবিবার, ২১ Jun ২০২৬, ০৫:৪৬ পূর্বাহ্ন

সর্বশেষ :
দেশের জনগণের অর্থ, বিদেশে পাচার হতে দেওয়া হবে না: প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সম্ভাবনা: তেলের দাম ৮০ ডলারের নিচে সিলেটে ফুলের পাপড়িতে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানালেন চা শ্রমিকরা ট্রাম্পের সঙ্গে নৈশভোজের মাধ্যমে জি-৭ সম্মেলনের সমাপ্তি টানছেন মাখোঁ ইরাককে বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করল নরওয়ে শিশু শ্রমিক নিয়োগের দায়ে ফেনীর কোয়ালিটি জুট মিলকে সতর্কতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও আটক সম্পদ মুক্তি ছাড়া কোনো চুক্তি নয়: ইরান বাজেটে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব খাল খনন ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’র সেই দিন ফিরিয়ে আনবে: পানিসম্পদ মন্ত্রীর
সমাজে হিজড়া জনগোষ্ঠী একটি অবহেলিত সম্প্রদায়!

সমাজে হিজড়া জনগোষ্ঠী একটি অবহেলিত সম্প্রদায়!

দেশের হিজড়া জনগোষ্ঠী একটি অবহেলিত এবং অনগ্রসর সম্প্রদায়। বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে এই সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার, তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক পরিচালিত জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী সংখ্যাটি ১২ হাজার ৬২৯ জন। অন্যদিকে, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই সংখ্যা বাস্তবে আরও বেশি, যা ৫০ হাজার বা তারও বেশি হতে পারে। ২০১৩ সালে সরকার তাদের “তৃতীয় লিঙ্গ” হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, তারা আজও সমাজে বৈষম্য, বর্জন এবং অন্যান্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত, যার ফলে তাদের জীবনযাত্রার মান খুবই নিম্ন।

হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা চ্যালেঞ্জিং। হিজড়ারা ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ে, সন্তানের জন্ম এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে মানুষকে শুভেচ্ছা জানায়। এর বিনিময়ে তারা অর্থ বা উপহার গ্রহণ করে। অনেক হিজড়া গণপরিবহন, রাস্তাঘাট এবং জনসমাগম স্থলে মানুষকে জোর করে অর্থ আদায় করে। এক্ষেত্রে তারা অনেক সময় আপত্তিকর ও আক্রমণাত্মক আচরণ করে থাকে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বিরক্তির কারণ হয়। কিছু হিজড়া তাদের গোষ্ঠীগত প্রথার অংশ হিসেবে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিছু হিজড়া নৃত্য, গান বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজেও জড়িত থাকে। তবে, সমাজে তাদের লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে এই সুযোগ সীমিত। যদিও সরকার ও সমাজ তাদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবুও তারা সমাজে সম্মানজনক জীবনযাপন করতে নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়।

হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্য নতুন জীবিকার ব্যবস্থা করতে তাদের দক্ষতা উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এর পাশাপাশি, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাদের নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া, ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রশিক্ষণ ও সহায়তা এবং সমাজে তাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা দরকার, যাতে তারা সমাজে স্বাভাবিক ও আত্মনির্ভরশীল জীবনযাপন করতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করলে হিজড়া সম্প্রদায় সমাজের মূলস্রোতে মিশে যেতে পারবে এবং মর্যাদাপূর্ণ ও আত্মনির্ভরশীল জীবনযাপন করতে পারবে।

আমরা অনেকেই ভুল করে হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডাদের একই সম্প্রদায়ের লোক মনে করি। হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডার দুটি ভিন্ন পরিভাষা হলেও প্রায়শই এদেরকে একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু, এদের মধ্যে গভীর সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক এবং সামাজিক পার্থক্য রয়েছে। হিজড়া মূলত ভারতীয় উপমহাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিচয়, অন্যদিকে ট্রান্সজেন্ডার একটি আধুনিক ও আন্তর্জাতিক পরিভাষা যা লিঙ্গ পরিচয়ের বিস্তৃত পরিসরকে ব্যাখ্যা করে। হিজড়া এবং ট্রান্সজেন্ডার উভয়ই লিঙ্গ পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হিজড়া একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়, আর ট্রান্সজেন্ডার একটি আধুনিক পরিভাষা যা ব্যক্তির লিঙ্গ পরিচয়কে আরও বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করে। এদের মধ্যেকার পার্থক্য বোঝা জরুরি।

ইসলামে হিজড়াদের অবস্থান ও অধিকার বিষয়ে কোরআন ও হাদিসে সরাসরি কোনো বিস্তারিত নির্দেশনা নেই, তবে ইসলামী শরীয়তের মূলনীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে তাদের বিষয়ে একটি অবস্থান তৈরি করা হয়েছে। অন্য আরেক স্থানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আকাশ ও পৃথিবীর আধিপত্য আল্লাহরই, তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করেন। তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যাসন্তান দান করেন, যাকে ইচ্ছা পুত্রসন্তান দান করেন অথবা দান করেন পুত্র-কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা। তিনি সর্বজ্ঞ সর্বশক্তিমান। [সুরা শুরা, আয়াত: ৪৯, ৫০] ইসলাম হিজড়াদেরকে মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের প্রতি মানবিক আচরণ ও অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলে। ইসলামে তাদের “তৃতীয় লিঙ্গ” বা “খুনসা” হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলাম বিশ্বাস করে যে হিজড়াদের সৃষ্টি আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায় এবং এটি তাঁর সৃষ্টির বৈচিত্র্যের অংশ। কোরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছা মানুষকে রূপ দেন। তাই হিজড়া হওয়া কোনো পাপ নয়, বরং এটি একটি শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। তাদের এই অবস্থার জন্য তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য বা অবহেলা করাকে ইসলামে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

ইসলামে সকল মানুষ সমান এবং মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। হিজড়াদেরও একই মর্যাদা ও সম্মান দিতে বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ মানুষের চেহারা বা সম্পদ দেখেন না, বরং তাদের অন্তর ও আমল দেখেন। তাই হিজড়াদের প্রতি ঘৃণা বা দুর্ব্যবহার করা পাপ। ইসলামে প্রতিটি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর আল্লাহর আদেশ-নিষেধ প্রযোজ্য। হিজড়ারাও এর ব্যতিক্রম নয়। তাদের জন্য নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত-এর মতো ইবাদতগুলো পালন করা আবশ্যক। তাদের শারীরিক গঠনের ওপর ভিত্তি করে তাদের জন্য নারী বা পুরুষের মতো বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। ইসলামী আইনে হিজড়াদের উত্তরাধিকারের বিষয়টি তাদের শারীরিক গঠনের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়। যদি কোনো হিজড়ার মধ্যে পুরুষের বৈশিষ্ট্য বেশি থাকে, তবে তাকে পুরুষের মতো উত্তরাধিকারের অংশ দেওয়া হয়, আর যদি নারীর বৈশিষ্ট্য বেশি থাকে, তবে তাকে নারীর মতো অংশ দেওয়া হয়। ইসলাম হিজড়াদের সকল প্রকার সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করতে বলে। এতে শিক্ষা, চিকিৎসা, এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। সমাজে তাদের প্রতি বৈষম্য দূর করা এবং তাদের জীবন-জীবিকার জন্য সহায়তা করা মুসলিম সমাজের দায়িত্ব।

হিজড়া সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য হলো তারা দক্ষিণ এশিয়ার এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা প্রচলিত নারী ও পুরুষের বাইনারি লিঙ্গ ব্যবস্থার বাইরে একটি স্বতন্ত্র লিঙ্গ পরিচয় বহন করে। তারা নির্দিষ্ট সামাজিক রীতি-নীতি অনুসরণ করে এবং বিভিন্ন উপায়ে নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে, যেমন গুরু-শিষ্য প্রথা বা গুরু-চেলা পদ্ধতি। ঐতিহাসিকভাবে তারা সমাজে আশীর্বাদ বা অভিশাপ দেওয়ার ক্ষমতা সম্পন্ন হিসেবে বিবেচিত হতো, যা তাদের একটি বিশেষ সামাজিক অবস্থান দিয়েছে। হিজড়া সম্প্রদায় মূলত দক্ষিণ এশিয়ার একটি আন্তঃলিঙ্গ বা তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠী, যারা একটি বিশেষ গুরু-চেলা পদ্ধতি অনুসরণ করে এবং নিজেদের “হিজড়া” হিসেবে পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করে। এই সম্প্রদায়টি বিশ্বজুড়ে বিভিন্নভাবে পরিচিত, যেমন পাকিস্তানে খাজা সিরা নামে পরিচিত।

মোহাম্মদ ইমরান স্বপন: সাহিত্যিক ও গণমাধ্যম কর্মী

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2025 thedailyagnikontho.com