রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৩৯ পূর্বাহ্ন
বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরি, পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং প্রচলিত ঋণনির্ভরতা কমাতে হংকংয়ে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশেষ তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, এটি ঋণ নয়; বরং ইকুইটি বিনিয়োগের তহবিল। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পুঁজি বাংলাদেশে বিনিয়োগের নতুন একটি পথ তৈরি হবে। আজ শনিবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত ‘বাইঅ্যানুয়াল ইকোনমিক স্টেট ইন এফওয়াই ২০২৬: ফিসকাল অ্যান্ড মনিটারি পার্সপেকটিভ অ্যান্ড প্রাইভেট সেক্টর এক্সপেকটেশনস’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আমীর খসরু বলেন, ‘আমরা হংকংয়ে বাংলাদেশের জন্য একটি বিশেষ তহবিল করতে যাচ্ছি। এটি হবে ২০০ কোটি ডলারের বাংলাদেশভিত্তিক তহবিল।’ তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ অর্থায়নের ওপর চাপ কমাতে সরকার আন্তর্জাতিক পুঁজি সংগ্রহের বিকল্প উৎস খুঁজছে। এ প্রেক্ষাপটে হংকংয়ে প্রস্তাবিত তহবিলটি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজি সংগ্রহের একটি বিকল্প মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে। অর্থমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের পুঁজিবাজার দুর্বল অবস্থায় ছিল। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের অর্থায়ন সুবিধা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এ কারণেই সরকার বিকল্প অর্থায়নের উৎস তৈরির পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘসময় ধরে বাংলাদেশে কার্যকর পুঁজিবাজার বলতে তেমন কিছু ছিল না।
তাই বিকল্প অর্থায়নের অন্যতম উৎস হিসেবে আমরা পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছি।’ পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে বলেও জানান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) নতুন নেতৃত্ব এসেছে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেখানে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবর্তনের ফলও ধীরে ধীরে দেখা যাচ্ছে। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে এবং বাজারও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলব না যে পুঁজিবাজার পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়েছে। তবে আস্থা ফিরছে। বাজার শক্ত অবস্থানে যাচ্ছে এবং ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে।
তবে শুধু বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরলেই হবে না বলে মনে করেন তিনি। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে মূলধন সংগ্রহ করতে আগ্রহী ভালো কোম্পানিগুলোরও বাজারের ওপর আস্থা থাকতে হবে। তিনি বলেন, ‘ভালো কোম্পানিগুলো তখনই তালিকাভুক্ত হতে আসবে, যখন তাদের বাজারের ওপর আস্থা থাকবে।’ পুঁজিবাজারের অতীত পরিস্থিতির সমালোচনা করে আমীর খসরু বলেন, একসময় বাজারটি কার্যত ‘ক্যাসিনোতে’ পরিণত হয়েছিল। সেখানে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও একটি অংশ সুবিধা নিয়েছে। সরকার এখন সেই সংস্কৃতি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্বচ্ছতা, পেশাদারত্ব ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে পুঁজিবাজারকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আমীর খসরু বলেন, সরকারের সংস্কার কার্যক্রম আন্তর্জাতিক তহবিল ব্যবস্থাপকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি, বৈশ্বিক তহবিল ব্যবস্থাপকরা এগিয়ে আসছেন। এটি খুবই ভালো খবর।’ প্রস্তাবিত ২০০ কোটি ডলারের হংকংভিত্তিক তহবিলও আন্তর্জাতিক ইকুইটি মূলধন বাংলাদেশে আনার উদ্যোগগুলোর একটি বলে জানান তিনি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যেহেতু এটি ঋণ নয়, তাই এ তহবিলের কারণে সরকার বা দেশের ওপর বাড়তি কোনো ঋণের দায় সৃষ্টি হবে না। বিদেশি অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণে সরকার আরও কয়েকটি আর্থিক উপকরণ ব্যবহারের কথাও ভাবছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমরা ডলার বন্ডে যেতে চাই। পান্ডা বন্ড এবং সামুরাই বন্ডেও যাব।’
আমীর খসরু বলেন, এসব উপকরণের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক বা প্রচলিত অর্থায়নের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বাংলাদেশে একাধিক বৈশ্বিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ পাবে। সরকারি অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ উৎসের ওপর নির্ভরতা কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ ও বিনিয়োগের আরও বেশি সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, সরকারি অর্থায়নের ক্ষেত্রে অতিরিক্তভাবে বেসরকারি খাত ও দেশীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা থেকে বাংলাদেশকে সরে আসতে হবে। আমীর খসরু মাহমুদ বলেন, ‘বিকল্প অর্থায়নের মাধ্যমে আমরা বেসরকারি খাত থেকে ঋণ নেওয়া কমানোর চেষ্টা করছি।’
সরকার ইতোমধ্যে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কিছুটা কমাতে পেরেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিকল্প অর্থায়নের দিকে পুরোপুরি সরে আসতে সময় লাগবে। তবে, বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের জন্য আরও বেশি সুযোগ তৈরি করতে সরকার এ উদ্যোগ অব্যাহত রাখবে বলেও জানান তিনি। কর ব্যবস্থার প্রসঙ্গ তুলে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য বর্তমানে কর দিচ্ছেন এমন করদাতাদের ওপর করের বোঝা বাড়ানো নয়; বরং করজাল সম্প্রসারণ করা। তিনি বলেন, ‘যখন আমরা কর বাড়ানোর কথা বলি, তখন যারা ইতিমধ্যে কর দিচ্ছেন, তাদের ওপর কর বাড়ানোর কথা বলছি না। আমরা করের আওতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি।’ টেকসইভাবে সরকারের রাজস্ব বাড়াতে করের আওতা সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কর প্রশাসনে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বা অটোমেশনের গুরুত্ব তুলে ধরে আমীর খসরু বলেন, করদাতা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ কমানো গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগও কমে আসবে। পুনরুজ্জীবিত পুঁজিবাজার, আন্তর্জাতিক ইকুইটি তহবিল, বিভিন্ন ধরনের বন্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন এবং করের আওতা সম্প্রসারণ- এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্য আরও টেকসই অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতনির্ভর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও আরও শক্তিশালী হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
Leave a Reply