শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
মোহাম্মদ ইমরান স্বপন: দেশের চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকট বর্তমানে দেশীয় অর্থনীতি, শিল্প খাত এবং সাধারণ জনজীবনের জন্য এক নজিরবিহীন বিপর্যয়কর রূপ ধারণ করেছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলেছে। পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৩,৮৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র এবং আমদানিকৃত এলএনজি মিলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র ২,০০০ থেকে ২,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যার অর্থ প্রতিদিন প্রায় ১,৭০০ থেকে ১,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের এক বিশাল ও অলঙ্ঘনীয় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। এই তীব্র ও দীর্ঘায়িত সংকটের নেপথ্যে রয়েছে বহুমুখী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কারণ। তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে বঙ্গোপসাগরের মহেশখালীতে অবস্থিত মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলোর উপর্যুপরি যান্ত্রিক ত্রুটি, অগ্নিকাণ্ড এবং সাগরের চরম বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজি কার্গো থেকে গ্যাস খালাস করতে না পারাকে দায়ী করা হচ্ছে।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সংকটের মূল শিকড় আরও গভীরে; বিগত দেড় দশক ধরে স্থলভাগ ও গভীর সমুদ্রে নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধানে চরম উদাসীনতা এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর অতিরিক্ত ও আত্মঘাতী নির্ভরতাই আজকে দেশকে এই খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং ইরানের রাজনৈতিক সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটে জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধি, যা রাষ্ট্রের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। এই গ্যাস সংকটের বহুমাত্রিক ও বিধ্বংসী আঘাত দেশের প্রতিটি সেক্টরে অনুভূত হচ্ছে, যার মধ্যে বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত। দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ১২,১৫৪ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানির অভাবে অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্র নিষ্ক্রিয় পড়ে আছে। ফলে দেশজুড়ে দৈনিক ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যা রাজধানী ঢাকায় ৪-৫ ঘণ্টা এবং মফস্বল ও প্রান্তিক গ্রামাঞ্চলে দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় রূপ নিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে নরকতুল্য করে তুলেছে। তীব্র গরমের মধ্যে এই লোডশেডিংয়ের কারণে জনস্বাস্থ্যের বিপর্যয় ঘটছে, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের নির্দেশে সারা দেশে রাত ৮টার পর সব ধরনের শপিং মল, বিপণিবিতান ও দোকানপাট বন্ধ রাখার কঠোর ও বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের চেয়েও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে দেশের শিল্প খাতের স্থবিরতা। সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের প্রেশার বা চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল মিলগুলোতে গ্যাসের চাপ না থাকায় ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট ও বয়লার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কারখানাগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে, যার ফলে উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের বেঁধে দেওয়া সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছেন না এবং অনেক ক্ষেত্রে চড়া মূল্যে বিমানযোগে পণ্য পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন; যা বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের সুনামের ওপর বড় ধাক্কা দিচ্ছে এবং কোটি কোটি ডলারের রপ্তানি অর্ডার বাতিলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সাথে সিরামিক, ইস্পাত এবং কাচ কারখানার মতো ভারী শিল্পগুলো, যেখানে সার্বক্ষণিক নির্দিষ্ট তাপমাত্রার গ্যাসের প্রয়োজন হয়, সেগুলো বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
এই সংকটের ধাক্কা সরাসরি এসে লেগেছে দেশের সাধারণ মানুষের রান্নাঘর এবং নিত্যপণ্যের বাজারে। দেশের অন্যতম শীর্ষ বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ সহ সিটি গ্রুপ ও টি কে গ্রুপের বড় বড় সয়াবিন তেল পরিশোধন কারখানা, চিনি কল এবং আটা-ময়দার মিলগুলো গ্যাসের অভাবে আংশিক বা পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। এর ফলে দেশের বাজারে চিনি, ভোজ্যতেল ও ময়দার মতো অতিপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে, যা কৃত্রিম সংকট ও অসাধু সিন্ডিকেটের হাত ধরে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিকে উসকে দিচ্ছে। বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ না থাকায় শহরের নারীদের গভীর রাত জেগে কিংবা ভোরবেলা রান্না শেষ করতে হচ্ছে, নতুবা চড়া মূল্যে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে পারিবারিক খরচ বাড়াতে হচ্ছে। অন্যদিকে, সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের চাপ না থাকায় দেশের পরিবহন খাতে তীব্র হাহাকার তৈরি হয়েছে। বাস, হিউম্যান হলার ও থ্রি-হুইলার চালকদের একটি সিলিন্ডার গ্যাস রিফিল করার জন্য সিএনজি পাম্পের সামনে ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে চালকদের দৈনিক আয় কমে গেছে, রাস্তায় গণপরিবহনের সংকট দেখা দিয়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে সাধারণ যাত্রীদের পকেট কাটছে, যা দেশের বিভিন্ন স্থানে ক্ষুব্ধ চালক ও সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ও সামাজিক অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
এই চরম জাতীয় সংকট উত্তরণে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন বা নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর এই সীমাহীন ভোগান্তির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং আশ্বস্ত করেছেন যে, সাগরের আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়া মাত্রই নতুন এলএনজি কার্গো খালাসের মাধ্যমে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে গ্যাসের এই তীব্র সংকট অনেকটাই প্রশমিত হবে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় আপৎকালীন জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত থেকে দ্রুত পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির আলোচনা চালাচ্ছে এবং পাইপলাইনের ওপর চাপ কমাতে ভোলা জেলা থেকে উৎপাদিত গ্যাস সরাসরি বিশেষ কন্টেইনারে করে শিল্পাঞ্চলে পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে জ্বালানি উপদেষ্টা আগামী ১০ বছরের একটি জ্বালানি মহাপরিকল্পনা সংসদে উত্থাপন করার ঘোষণা দিয়েছেন, যার আওতায় আগামী নভেম্বরের মধ্যে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং আগামী কয়েক বছরে বাপেক্সের মাধ্যমে দেড়শ নতুন কূপ খনন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে বড় ছাড় দিয়ে সোলার প্যানেলের ব্যাটারি ও ইনভার্টারের ওপর শুল্ক কমিয়ে ৫ শতাংশে এনেছে।
সাময়িক জোড়াতালি বা বিদেশি এলএনজি আমদানির ওপর শতভাগ ভরসা করে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান কখনোই সম্ভব নয়। এই চক্রাকার জ্বালানি সংকট থেকে দেশকে চিরতরে মুক্ত করতে হলে সরকারকে আমদানিনির্ভর থেকে বের হয়ে অবিলম্বে নিজস্ব স্থলভাগ ও সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধানে শতভাগ জোর দিতে হবে, বাপেক্সকে আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে, এবং সাগরের আবহাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি দ্রুত স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ সম্পন্ন করতে হবে। একই সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস ও কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির অনুপাত দ্রুত বাড়াতে হবে এবং গ্যাস খাতে চলমান অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লস ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে; অন্যথায় দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এক দীর্ঘমেয়াদি ও অপরিবর্তনযোগ্য অন্ধকারের দিকে ধাবিত হতে পারে।
Leave a Reply